৮২ নং আয়াতের তাফসীর:
৮২-৮৬ নং আয়াতে পূর্ববর্তী জাতির মধ্য হতে যারা ইসলাম ও মুসলিমদের প্রধান শত্র“ এবং যারা বন্ধুত্বের দিক দিয়ে অধিক নিকটবর্তী তাদের পরিচয় বর্ণনা করা হয়েছে।
ইসলাম ও মুসলিমদের প্রধান শত্র“ হল ইয়াহূদী ও মুশরিকরা। তাদেরকে বাহ্যিক মুসলিমদের কল্যাণকামী দেখা গেলেও ভেতরে ভেতরে এরা মুসলিমদের ক্ষতি ও সমূলে ধ্বংস করার নীল-নকশা করে থাকে। যেমন মদীনায় ইয়াহূদীগণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে হত্যা করার জন্য কয়েকবার অপচেষ্টা করেছিল। আজও মুসলিমদেরকে সমূলে ধ্বংস করার জন্য তাদের অপচেষ্টা অব্যাহত আছে, যার দরুন একের পর এক মুসলিম দেশগুলো দখল, তাদের ওপর হামলা ও নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে।
পক্ষান্তরে মুসলিমদের প্রতি সৌহার্দ্য, ঘনিষ্ঠতা ও বন্ধূত্বের দিক থেকে অধিক নিকটবর্তী হল খ্রিস্টানগণ। এদের মধ্যে নম্রতা, উদারতা, ক্ষমাশীলতা ও ধর্মাবলম্বিতা তুলনামূলক অন্যদের চেয়ে বেশি রয়েছে। এদের অধিকাংশ ইসলাম গ্রহণ করেছে। যেমন হাবশার বাদশা নাজ্জাশী ও তাঁর সহচর্যগণ। বদর যুদ্ধে কুরাইশদের বড় বড় নেতারা নিহত হওয়ার পর তারা বলল: হাবশায় যে সকল মুসলিম রয়েছে তাদেরকে এনে হত্যা করে প্রতিশোধ নিতে পারো। অতএব বাদশা নাজ্জাশীর জন্য কিছু উপঢৌকনসহ দু’জন বিজ্ঞ ব্যক্তিকে প্রেরণ কর হয়তো তিনি সেখানকার মুসলিমদেরকে ফেরত দেবেন। কুরাইশরা আমর বিন আস ও আব্দুল্লাহ বিন রবী‘আহকে উপঢৌকনসহ প্রেরণ করল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ কথা শুনে নাজ্জাশীর প্রতি একটি চিঠিসহ আমর বিন উমাইয়্যাহ আয-যমরীকে প্রেরণ করলেন। চিঠি নিয়ে আগমন করলে নাজ্জাশী তা পড়ার পর জাফর বিন আবূ তালেব ও মুহাজির সাহাবীদের ডাকলেন এবং তথাকার খ্রিস্টান পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগীদের নিয়ে আসলেন।
অতঃপর জাফরকে কুরআন তেলাওয়াত করতে বললেন, তিনি সূরা মারইয়াম-এর কিছু অংশ তেলাওয়াত করলেন। এতে তাদের চোখ দিয়ে অশ্র“ ঝঁরতে থাকে। এদের ব্যাপারেই আল্লাহ তা‘আলা নাযিল করেছেন:
(وَلَتَجِدَنَّ اَقْرَبَھُمْ مَّوَدَّةً لِّلَّذِیْنَ اٰمَنُوا الَّذِیْنَ قَالُوْٓا اِنَّا نَصٰرٰی)
“এবং যারা বলে ‘আমরা খ্রিস্টান’ মানুষের মধ্যে তাদেরকেই তুমি মু’মিনদের নিকটতর বন্ধুত্বে দেখবে।” (কুরতুবী)।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَجَعَلْنَا فِیْ قُلُوْبِ الَّذِیْنَ اتَّبَعُوْھُ رَاْفَةً وَّرَحْمَةً)
“এবং তার অনুসারীদের অন্তরে দিয়েছিলাম করুণা ও দয়া।”(সূরা হাদীদ ৫৭:২৭)
মুসলিমদের প্রতি তাদের সৌহার্দ্য, ঘনিষ্ঠতা ও বন্ধুত্বের কয়েকটি কারণ আল্লাহ তা‘আলা তুলে ধরেছেন। (১)
(قِسِّیْسِیْنَ وَرُھْبَانًا)
‘পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগী’ অর্থাৎ তাদের মাঝে আলেম ও ইবাদতগুজারী মানুষ ছিল। তারা সত্য অনুধাবন করতে পেরেছে, তারা বুঝতে পেরেছে এ কুরআন সত্য এবং এর অনুসারীরাই সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত।
(২) (وَّاَنَّھُمْ لَا یَسْتَکْبِرُوْنَ)
‘আর তারা অহঙ্কারও করে না’অর্থাৎ সত্য গ্রহণ ও মেনে নিতে তাদের কোন অহংকার ও হঠকারিতা নেই। সত্য জানার পর অংকারবশত তা বর্জন করে না।
সুতরাং সত্য জানার পর মাথা পেতে নেয়া উচিত, কোন কিছুর দোহাই দিয়ে বা অহংকারবশত তা বর্জন করা সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার নামান্তর মাত্র।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. ইসলাম ও মুসলিমদের প্রধান শত্রু হল ইয়াহূদী জাতি।
২. অমুসলিমদের মধ্য হতে ইসলাম ও মুসিলমদের বন্ধুত্বের নিকটবর্তী হল খ্রিস্টানরা, যারা স্ব ধর্মের ওপর বহাল রয়েছে।
৩. সাধারণত নম্র, ভদ্র ও উদার মনের মানুষেরাই আল্লাহ তা‘আলার দীন গ্রহণে অগ্রগামী।