৯ নং আয়াতের তাফসীর:
এখানে قَصْدُ السَّبِيْلِ বলতে সিরাতুল মুসতাকিম বা সরল পথকে বুঝানো হয়েছে। যাতে কোন প্রকার বক্রতা নেই। যে পথে চললে আল্লাহ তা‘আলার সাক্ষাত পাওয়া যাবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَأَنَّ هٰذَا صِرَاطِيْ مُسْتَقِيْمًا فَاتَّبِعُوْهُ ج وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيْلِه۪)
“আর নিশ্চয়ই এ পথই আমার সহজ-সরল পথ। সুতরাং তোমরা এরই অনুসরণ করবে এবং বিভিন্ন পথ অনুসরণ করবে না, করলে তোমাদেরকে তাঁর পথ হতে বিচ্ছিন্ন করবে।” (সূরা আনয়াম ৬:১৫৩)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(وَأَنِ اعْبُدُوْنِيْ هٰذَا صِرَاطٌ مُّسْتَقِيْمٌ)
“আর আমারই ইবাদত কর, এটাই সরল-সঠিক পথ।” (সূরা ইয়াসিন ৩৬:৬১)
আল্লাহ তা‘আলার দায়িত্ব হল সরল সঠিক পথের দিশা দেয়া এবং তিনি তা করেছেন। সরল সঠিক পথের দিশা দেয়ার সাথে সাথে একথাও বলে দিয়েছেন যে, সরল পথের পথিমধ্যে কিছু বক্র পথও রয়েছে, যে পথে চললে সে আল্লাহ তা‘আলার রহমত থেকে দূরে সরে যাবে। সে পথে চললে গোমরাহ হয়ে যাবে। সাহাবী জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলছেন একদা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি সরল রেখা টানলেন, আর ডান দিকে দুটি রেখা টানলেন ও বাম দিকে দুটি রেখা টানলেন। তারপর মাঝের সরল রেখার ওপর হাত রেখে বললেন: এটা হল আল্লাহ তা‘আলার পথ। (ইবনু মাযাহ হা: ১১, সহীহ)
আল্লাহ তা‘আলা উভয় পথেরই বর্ণনা দিয়ে সিরাতে মুসতাকিম তথা সরল সঠিক পথে চলার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে কোন পথে চলতে বাধ্য করে দেননি। যদি বাধ্য করে দেয়া হত তাহলে পরীক্ষা নেয়ার কোনই প্রয়োজন ছিল না। সুতরাং সঠিক ও ভুল পথের বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা‘আলা সঠিক পথে চলার নির্দেশ দিয়ে উক্ত পথে চলার ফলাফল বর্ণনা করে দিয়েছেন যাতে হাতে-নাতে শিক্ষা দেয়ার জন্য মানুষ আল্লাহ তা‘আলাকে দোষারোপ করতে না পারে। তাছাড়া আল্লাহ তা‘আলা পথপ্রদর্শক হিসেবে যুগে যুগে নাবী-রাসূল পাঠিয়েছেন।
আল্লাহ তা‘আলার বাণী: “যারা সৎ পথ অবলম্বন করবে তারা নিজেদেরই মঙ্গলের জন্য সৎ পথ অবলম্বন করবে এবং যারা পথভ্রষ্ট হবে তারা পথভ্রষ্ট হবে নিজেদেরই ধ্বংসের জন্য এবং কেউ অন্য কারো (পাপের) ভার বহন করবে না। আমি রাসূল না পাঠান পর্যন্ত কাউকেও শাস্তি দেই না।” (সূরা ইসরা ১৭:১৫)
সুতরাং কেউ যদি পথভ্রষ্ট হয় তাহলে আল্লাহকে দোষারোপ করার সুযোগ নেই। কারণ তিনি সব কিছু বিস্তারিত বর্ণনা করে দিয়ে যুগে যুগে নাবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন, আর কেউ হিদায়াত প্রাপ্ত হলে তা আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া।
(وَلَوْ شَا۬ءَ لَهَدَاكُمْ أَجْمَعِيْنَ)
আল্লাহ তা‘আলা বলেন যে, তিনি চাইলে সকলকে হেদায়েত দান করতে পারতেন। এর দ্বারা কোন মানুষ এমনটি বলতে পারবে না যে, আল্লাহ তা‘আলা চাননি তাই আমি হিদায়াত পাইনি। তাই আল্লাহ তা‘আলার কারণে আমাকে জাহান্নামে যেতে হলে সেখানে আমার কোন হাত নেই। এটি ভুল, কারণ পূর্বেই বলা হয়েছে মানুষকে সৃষ্টি করার পর জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে হিদায়াত ও গোমরাহ উভয় পথ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করার পর স্বাধীনতা দিয়েছেন, সে তার খুশি মত যে কোন রাস্তা বেছে নিতে পারবে। তবে কোন্ পথে চললে কী ফলাফল হবে তাও বর্ণনা করে দিয়েছেন। সুতরাং যারা খাল কেটে কুমির আনে তারা হিদায়াতের উপযুক্ত হতে পারে না।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَلَوْ شَا۬ءَ اللّٰهُ لَجَمَعَهُمْ عَلَي الْهُدٰي فَلَا تَكُوْنَنَّ مِنَ الْـجٰهِلِيْنَ)
“আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের সকলকে অবশ্যই সৎ পথে একত্র করতেন। সুতরাং তুমি মুর্খদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (সূরা আনয়াম ৬:৩৫)
অতএব মানুষ ইচ্ছা করে যে পথ বেছে নেবে সে ঐ পথেরই অনুসারী হবে। এতে কাউকে দোষারোপ করা যাবে না।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. সরল ও বক্রপথ উভয়টা দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে।
২. আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে কোন কাজ করার ব্যাপারে বাধ্য করেন না।
৩. রাসূল প্রেরণ করার পূর্ব পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলা কোন জাতিকে শাস্তি দেন না।
৪. সরল-সঠিক পথ একটিই তা হল, কুরআন ও সহীহ সুন্নার অনুসরণ করা। কোন তরীকা, পথ-মত ও ব্যক্তির আদর্শ হতে পারে না।
৫. হিদায়েত দেয়ার একমাত্র মালিক আল্লাহ তা‘আলা, তবে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে হিদায়াত দেন না যারা হিদায়াত গ্রহণ করার চেষ্টা করে না।