১৮৭ নং আয়াতের তাফসীর:
শানে নুযূল:
বারা বিন আযেব (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাহাবীদের মধ্যে থেকে যদি কোন ব্যক্তি সিয়াম পালন করত আর ইফতারের সময় ইফতার না করে ঘুমিয়ে যেত তাহলে পরদিন ইফতারের পূর্ব পর্যন্ত না খেয়ে থাকতে হত। একদিন কায়েস বিন সিরমা (রাঃ) সিয়াম অবস্থায় সারাদিন ক্ষেত-খামারে কাজ করে সন্ধ্যার সময় বাড়িতে ফিরে আসেন। স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করেন- খাবার কিছু আছে কি? স্ত্রী বলল, কিছুই নেই। তবে আমি যাচ্ছি এবং কোথাও হতে কিছু নিয়ে আসছি এ কথা বলে তাঁর স্ত্রী গেলে তিনি ঘুমিয়ে যান। স্ত্রী ফিরে এসে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখে দুঃখ প্রকাশ করে বলল, এখন এ রাত্রি এবং পরবর্তী সারাদিন কিভাবে কাটবে? দিনের অর্ধভাগ অতিবাহিত হলে কায়েস (রাঃ) ক্ষুধার জ্বালায় চেতনা হারিয়ে ফেলেন।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এ কথা জানানো হলে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (সহীহ বুখারী হা: ১৯১৫)
উক্ত আয়াত অবতীর্ণ করে আল্লাহ তা‘আলা মুসলিমদের কষ্টকর অবস্থা থেকে পরিত্রাণ দেন এবং ইফতারের সময় থেকে ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী সহবাস করার অনুমতি দান করেন।
অন্য বর্ণনায় রয়েছে তিনি বলেন: যখন রমাযানের সওমের হুকুম অবতীর্ণ হল তখন মুসলিমরা গোটা রমাযান মাস স্ত্রীদের নিকটে যেতেন না। আর কিছু সংখ্যক লোক এ ব্যাপারে নিজেদের ওপর (স্ত্রী-সম্ভোগ করে) অবিচার করে বসে। তখন আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন,
(عَلِمَ اللہُ اَنَّکُمْ کُنْتُمْ تَخْتَانُوْنَ اَنْفُسَکُمْ فَتَابَ عَلَیْکُمْ وَعَفَا عَنْکُمْﺆ)
(সহীহ বুখারী হা: ৫৪০৯, সহীহ মুসলিম হা:১০৯০)
اِلٰی نِسَا۬ئِکُمْ) (الرَّفَثُ
এখানে الرَّفَثُ শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য হল স্ত্রী সহবাস করা। (مَا کَتَبَ اللہُ لَکُمْ) ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য যা লিপিবদ্ধ করেছেন’এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল সন্তান। অর্থাৎ রমযানের রাতে তোমাদের স্ত্রীদের সাথে দৈহিক মিলন করতে পারো এবং সে মিলনের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের জন্য যে সন্তান নির্ধারণ করে রেখেছেন তা আল্লাহ তা‘আলার কাছে চাও।
সাহাল বিন সা‘দ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:
(وَکُلُوْا وَاشْرَبُوْا حَتّٰی یَتَبَیَّنَ لَکُمُ الْخَیْطُ الْاَبْیَضُ مِنَ الْخَیْطِ الْاَسْوَدِ)
আয়াতটি যখন অবতীর্ণ হয় তখন (مِنَ الْفَجْرِ) অংশটুকু অবতীর্ণ হয়নি। এমতাবস্থায় কোন ব্যক্তি যদি সিয়াম পালন করার ইচ্ছা করত তখন সাদা সুতো ও কালো সুতো তার পায়ে বেঁধে নিত। সাদা সুতো ও কালো সুতো সুস্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত খেতেই থাকত। তখন (مِنَ الْفَجْرِ) অংশটুকু অবতীর্ণ হয়। (সহীহ বুখারী হা: ১৯১৭, ৪৫১১, সহীহ মুসলিম হা: ১০৯১)
সুবহে সাদেক পর্যন্ত পানাহার শেষ করে রাত পর্যন্ত সিয়াম পালন করতে হবে। সূর্যাস্তের মাধ্যমে রাত শুরু হয়। তাই সূর্যাস্তের সাথে সাথেই ইফতার করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। হাদীসেও এসেছে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
(لَا يَزَالُ النَّاسُ بِخَيْرٍ مَا عَجَّلُوا الْفِطْرَ)
মানুষ সর্বদা কল্যাণে থাকবে যতক্ষণ (সূর্যাস্তের পর) তাড়াতাড়ি ইফতার করবে। (সহীহ বুখারী হা: ১৮৫৬, সহীহ মুসলিম হা: ১০৯৮) সূর্যাস্তের পর বিলম্ব করে অন্ধকার হবার পর ইফতার করা ইয়াহূদী ও শিয়াদের বৈশিষ্ট্য, সুতরাং তা অবশ্যই বর্জনীয়।
(وَاَنْتُمْ عٰکِفُوْنَﺫ فِی الْمَسٰجِدِ)
‘আর তোমরা মাসজিদে ই‘তেকাফ করা অবস্থায়’অর্থাৎ ইতিকাফ অবস্থায় স্ত্রী সহবাস ও তার সাথে কোন প্রকার যৌনাচার করার অনুমতি নেই। হ্যাঁ, দেখা-সাক্ষাত ও সাধারণ কথাবর্তা জায়েয। الْمَسٰجِدُ দ্বারা বুঝা যায় ইতিকাফ মাসজিদে করতে হবে। পুরুষ হোক অথবা মহিলা হোক। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রীগণও মাসজিদে ইতিকাফ করতেন (সহীহ বুখারী হা: ২০৩৩)। তাই মহিলাগণও মাসজিদে ইতিকাফ করবে তবে মহিলাদের জন্য সম্পূর্ণ পৃথক ব্যবস্থা থাকতে হবে।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. রমাযানের রাতে ফজরের পূর্ব পর্যন্ত পানাহার করা ও স্ত্রী সহবাস বৈধ।
২. সূর্যাস্তের সাথে সাথে ইফতার করা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাত আর বিলম্ব করে ইফতার করা ইয়াহূদীদের স্বভাব।
৩. পুরুষ-মহিলা উভয়ের জন্য মাসজিদে ইতিকাফ বৈধ। তবে সম্পূর্ণ পৃথক ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৪. স্ত্রী সহবাসের অন্যতম উদ্দেশ্য হবে সন্তান নেয়া।